আল্লাহ বলেন: 'আমিই আল্লাহ, আমি ছাড়া সত্যিকারের কোন ইলাহ নেই, কাজেই আমার ইবাদাত কর, আর আমাকে স্মরণ করার উদ্দেশ্যে নামায কায়েম কর-২০:১৪। নিশ্চয়ই নামায বিরত রাখে অশ্লীল ও মন্দ কাজ হতে। আল্লাহর স্মরণই সর্বশ্রেষ্ঠ-২৯:৪৫। আর যে আমার স্মরণে বিমুখ তার জীবন যাপন হবে সংকুচিত-২০:১২৪। যে ব্যক্তি দয়াময় আল্লাহর স্মরণে বিমুখ হয় আমি তার জন্য নিয়োজিত করি এক (অদৃশ্য) শয়তান, অতঃপর সে হয় তার (মনের) সহচর-৪৩:৩৬। নিঃসন্দেহে আমি অবিশ্বাসীদের জন্য শয়তানকে বন্ধু ও অভিভাবক বানিয়ে দিয়েছি-৭:২৭। আল্লাহই হচ্ছেন বিশ্বাসীদের অভিভাবক। তিনি তাদেরকে অন্ধকার হতে আলোর দিকে নিয়ে যান-২:২৫৭। এই কুরআন সমগ্র জগতবাসীর জন্য উপদেশের ভান্ডার ছাড়া কিছুই নয়-৬:৯০। প্রতিটি প্রাণী মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। আর অবশ্যই কিয়ামতের দিনে তাদের প্রতিদান পরিপূর্ণভাবে দেয়া হবে-৩:১৮৫। তোমাদের মধ্যে ঐ ব্যক্তিই আল্লাহর নিকট অধিক মর্যাদা সম্পন্ন যে অধিক মুত্তাকী-৪৯:১৩।'

শীর্ষ দশ হালাল বিনোদন

অনেক মুসলিমের মধ্যেই এই ভুল ধারণা আছে যে, বিনোদন হারাম। ডাহা মিথ্যা কথা! বিনোদন মানুষের স্বভাবজাত প্রকৃতির একটা অংশ। আর ইসলাম হলো ফিতরাহ বা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তির ধর্ম। বিনোদনের অধিকাংশ ধরনই হালাল। অল্প কিছুসংখ্যক ধরন রয়েছে, যেগুলো হারাম। আর দুর্ভাগ্যজনকভাবে অধিকাংশ মুসলিমই হারাম সেসব বিনোদনের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন।

আমার পছন্দের দশটি হালাল বিনোদন নিয়ে এ প্রবন্ধ। এক্ষেত্রে একটি কথা মাথায় রাখতে হবে, হালাল বিনোদনও হারাম হয়ে যায়-যদি কেউ তাতে অতিরিক্তভাবে জড়িয়ে যায় এবং ইসলামি কর্তব্য নিয়ে হেলাফেলা শুরু করে। তো আর দেরি কেন? চলুন, দেখে নিই শীর্ষ দশ হালাল বিনোদন।

দশ. বাইরে খাওয়া
বাইরে খেতে কে না পছন্দ করে। ফাস্টফুড শপে গিয়ে নিজের প্রিয় চিকেন টিকা কিংবা বার্গার ইয়াম! হয়তো নাম শুনেই কারও জিভে জল চলে এলো। বাইরে খাওয়া-দাওয়া সব সময়ই মজার, বিশেষ করে যখন বন্ধু-বান্ধবদের সাথে একসঙ্গে যাওয়া হয়। আর এটা অবশ্যই হালাল। শুধু খেয়াল রাখবেন, মুরগিটা যেন হালাল হয়।

নয়. বই পড়া
বই পড়া সবাই পছন্দ না-ও করতে পারে, তবে আমি পছন্দ করি। একই সঙ্গে আয়েশ করার জন্য এবং নিজের মনকে সবকিছু থেকে একটু দূরে রাখার জন্য বইয়ের চেয়ে ভালো বিকল্প আর হয় না। পড়ার আগে অবশ্যই আপনাকে এমন বই বেছে নিতে হবে, যার বিষয়বস্তু হালাল। আর যতদিন না আপনি ভালো-মন্দের মধ্যে পার্থক্য করতে পারছেন এবং অমুসলিম লেখকদের বই পড়ার মতো অবস্থানে যেতে পারছেন, ততদিন পর্যন্ত নির্ভরযোগ্য ইসলামি ভাবধারার লেখকদের বই পড়াই বাঞ্ছনীয়। ভুলে যাবেন না, কুরআনের প্রথম আদেশই কিন্তু 'পড়ো'। কাজেই বই পড়ুন, ভালো বই পড়ুন, বই পড়া উপভোগ করুন। বই পড়তে আমাদের সবার যেন ভালো লাগে, আল্লাহ আমাদের সেই তাওফিক দিন।

আট. সাঁতার কাটা
তপ্ত গরমে নিজের শরীরকে 'কুল' রাখার জন্য সাঁতারের চেয়ে ভালো আর কী হতে পারে! আর এটা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-ও বলে গেছেন। শুধু খেয়াল রাখুন, আপনার শরীর ঢাকা আছে কি না। তবে আর দেরি কেন? ঝাঁপিয়ে পড়ুন এক্ষুনি!

সাত. বিশ্রাম নেওয়া
সারাদিন নিশ্চয় কেউ নামাজ পড়ে কাটিয়ে দিতে পারে না। কাজের ফাঁকে ফাঁকে, ইবাদতের বাঁকে বাঁকে আমাদের অবশ্যই বিশ্রাম নিতে হয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ সবকিছুতেই ভারসাম্য ধরে রাখতে বলেছেন। এটার জন্য যেমন সময় আছে, ওটার জন্যও তেমন সময় আছে।

আমরা যেন আমাদের দিনের কাজগুলোকে ভাগ করে চলি। ইসলামি কাজ ও পারিবারিক দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখি। যখন ক্লান্ত হয়ে পড়বেন, কাজের চাপ আর বাড়াবেন না। শান্ত হয়ে বসুন, বিশ্রাম নিন। তাই বলে নামাজের সময়টায় যেন আবার ঘুমিয়ে পড়বেন না।

ছয়. ভিডিও গেমস ও ভিডিও
সব ভিডিও গেমস ও ভিডিওই হারাম নয়। ভিডিওতে কী দেখানো হচ্ছে বা ভিডিও গেমসটা কী নিয়ে, সেটার ওপর নির্ভর করে ভিডিও বা ভিডিও গেমসটা হারাম কি-না। আপনি যদি গেমস খেলতে পছন্দ করেন এবং দৈনন্দিন কাজের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে চলতে পারেন, তাহলে গেমস খেলায় কোনো আপত্তি নেই। তবে সাবধান! গেমস খেলার প্রতি আসক্ত হয়ে যাবেন না। আর খেললেও হালাল গেম খেলবেন (তার মানে গ্র্যান্ড থেফ্ট অটো এই জাতীয় গেম চলবে না!)। মুভি ও অন্যান্য ভিডিওর ক্ষেত্রেও একই কথা। ইসলামি অথবা যে ভিডিও দেখলে কাজে দেবে–এমন কিছু দেখুন। যেসব মুভিতে অশ্লীল দৃশ্য থাকে এবং অনুপযুক্ত জিনিস শেখায়–সেগুলো থেকে দূরে থাকুন।

আসক্ত না হওয়াটাই মূলকথা এখানে। মাগরিবের সময় পেরিয়ে যাচ্ছে আর এদিকে আপনি ফিফা নিয়ে ব্যস্ত! এমনটা ঠিক হবে না। সেক্ষেত্রে গেমস খেলাটা আপনার জন্য হারাম হয়ে যাবে। ব্যালান্স করার চেষ্টা করুন। সতর্ক থাকুন। হালাল গেমস ও ভিডিও বাছাই করুন। জেনে-বুঝে হারাম ভিডিও ও ভিডিও গেমস কিনবেন না। কারণ, আর যা-ই হোক, আপনি আল্লাহকে বোকা বানাতে পারবেন না। আপনার সাথে যে দুজন ফেরেশতা সর্বক্ষণ অবস্থান করছেন, তাঁরা কিন্তু ঠিকই আপনার আমলনামায় আপনার কৃতকর্ম পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে লিখে রাখছেন।

পাঁচ. প্রকৃতি
প্রকৃতি আমার খুব পছন্দের। সাগর, বন, পশুপাখি প্রকৃতির মায়াটাই অন্যরকম। আমি যখন প্রকৃতির সান্নিধ্যে থাকি, তখন মানসিকভাবে খুব শান্তি অনুভব করি। নিজেকে আল্লাহর বেশি কাছাকাছি মনে হয় তখন। কোনো গাছের নিচে কিংবা পাহাড়ের ওপর নামাজ পড়ার মতো অনুভূতি আর কীসে! আমি কিন্তু মোটেও বাড়িয়ে বলছি না। বিশ্বাস নাহয় তো আপনার পরবর্তী ছুটির দিনগুলো প্রাকৃতিক কোনো নয়নাভিরাম স্থানে বুকিং দিয়ে নিজেই পরখ করে আসুন!

চার. নাশিদ
নাশিদও আমার খুব পছন্দের। নাশিদের মাঝে আমি খুঁজে পেয়েছি প্রচলিত গান-বাজনার আদর্শ বিকল্প। নাশিদ একই সঙ্গে যেমন উপভোগ্য, তেমনি শিক্ষণীয়। কথিত আছে, 'উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুম বলেছেন—

'গান সফরকারীর সঙ্গী।'

বর্ণনাটি কতটুকু সহিহ জানি না, তবে ইমাম মালিক বলেছেন যে, ভ্রমণের সময় গান গাওয়ায় কোনো দোষ নেই। তো আজই আপনার প্লেলিস্টে মতিউর রহমান মল্লিক, কাজী নজরুল, সাইফুল্লাহ মানসুরের গান যুক্ত করুন। ছুড়ে ফেলে দিন সব হারাম মিউজিক। কাজে যেতে, কাজ থেকে ফিরতে উপভোগ করুন হালাল গান–নাশিদ।

তিন. সৎ সঙ্গের সাথে ঘোরাফেরা
বন্ধুরাই আপনাকে গড়ে তোলে, আবার এই বন্ধুরাই আপনার ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন—

'প্রত্যেক ব্যক্তি তার বন্ধুর ধর্ম অনুসরণ করে। কাজেই কাকে বন্ধু বানাচ্ছেন–সে ব্যাপারে সতর্ক হও।' আহমাদ, আবু দাউদ

আমরা সবাই সামাজিক জীবনযাপন করি। আমাদের বন্ধুদের সাথে দেখা করার মাঝে, ঘোরাফেরার মাঝে আনন্দ খুঁজে পাই। কিন্তু সঠিক বন্ধুদের সাথে চলাটা গুরুত্বপূর্ণ। আপনার বন্ধুরাই হয় আপনাকে নামাজ পড়তে উৎসাহিত করবে অথবা নামাজ বাদ দিয়ে মুভি দেখতে বলবে। এরাই বলবে আপনাকে হিজাবে দারুণ লাগছে কিংবা বুড়িদের মতো লাগছে। কাজেই দিনশেষে আপনি কাদের সাথে চলাফেরা করছেন, তারাই আপনার জীবনে সবচেয়ে বড়ো পার্থক্য গড়ে দেবে।

দুই. বাচ্চাদের সাথে খেলাধুলা করা
আমার নিজের দুটো বাচ্চা ছেলে আছে। আরও আছে ছোটো ছোটো ভাগ্নে, ভাই, ভাতিজা। বলতে গেলে আমাদের পরিবার বাচ্চা-কাচ্চায় ভরপুর। এসব নিষ্পাপ, মিষ্টি মুখের বাচ্চাদের সাথে খেলতে আমি ব্যক্তিগতভাবে খুব পছন্দ করি। এসব সোনামণিরা আমার আনন্দের উৎস, নয়নের শীতলতা। বাচ্চাদের যারা পছন্দ করে না, আমি তাদের একদম দেখতে পারি না। এ ধরনের লোকদের জন্যই অনেক শিশু প্রচণ্ড মানসিক আঘাত নিয়ে বড়ো হয়, মসজিদকে ঘৃণা করতে করতে একসময় ইসলামকেই ঘৃণা করতে শুরু করে। বাচ্চাদের সাথে খারাপ ব্যবহার করা মোটেও ইসলামসম্মত নয়।

রাসূলুল্লাহ ﷺ তো মসজিদেও বাচ্চাদের সাথে খেলেছেন। মাঝে মাঝে তিনি তাঁর সিজদা দীর্ঘায়িত করতেন। কারণ, নাতিরা তাঁর পিঠের ওপর উঠে খেলত।

এটাই সুন্নাহ! মসজিদ থেকে তাড়িয়ে দেওয়া, বাচ্চাদের দেখলেই বকাবকি করা সুন্নাহ নয়। তাই আনন্দ করার অন্যতম সুন্নাহ সমর্থিত উপায় হলো বাচ্চাদের সাথে খেলা করা।

আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহুম বর্ণনা করেছেন—

'আকরা ইবনে হাবিসের উপস্থিতিতে রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর নাতি হাসান ইবনেআলির কপালে চুমু খেয়েছেন। এটা দেখে আকরা বললেন—“আমার দশটা সন্তান আছে, কিন্তু আমি তাদের কাউকেই কখনো চুমু খাইনি।” এটা শুনে রাসূলুল্লাহ ﷺ তার দিকে তাকিয়ে বললেন—“যে অন্যদের দয়া দেখায় না, তাকেও দয়া দেখানো হবে না।” সহিহ বুখারি ও মুসলিম

পরবর্তী সময়ে কখনো যদি কোনো শিশুর ব্যাপারে নির্দয় হন, তাহলে এই হাদিসটির কথা মাথায় রাখবেন।

এক. বিয়ে
বিপরীত লিঙ্গের কারও সান্নিধ্যে থাকা মানুষের প্রকৃতগত স্বভাব। এ ধরনের পরিস্থিতিতে মানুষ সবচেয়ে বেশি আনন্দ পায়, বিশেষ করে তাদের মধ্যে যদি থাকে নিখাদ ভালোবাসা। ইসলাম একে নিষিদ্ধ করে না; বরং বিয়ের মাধ্যমে আনন্দের এই ধরনটিকে খুব বেশি উৎসাহ দেয়। তো আজই আপনার বয়ফ্রেন্ড কিংবা গার্লফ্রেন্ডকে না বলুন। কোনো ধার্মিক ব্যক্তিকে দেখে বিয়ে করে ফেলুন। নিজেও ধার্মিক হোন।

অসংখ্যবার রাসূলুল্লাহ ﷺ বিয়ের গুরুত্বের কথা বলেছেন। বিয়ের মাধ্যমে আনন্দ করার গুরুত্বের ব্যাপারেও বলেছেন। আপনার বিবাহিত জীবন যদি গতি হারায়, তাহলে আপনার পুরো জীবনই হবে বিপর্যস্ত। কিন্তু আপনার বিবাহিত জীবন যদি সুখী হয়, তাহলে যেকোনো সমস্যাই আপনি মোকাবিলা করতে পারবেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর স্ত্রীদের সাথে আনন্দ করতেন। তিনি তাঁদের সাথে দৌড় প্রতিযোগিতা করতেন, তাঁদের সাথে কৌতুক করতেন। একবার তো তাঁর স্ত্রীদের সাথে তিনি খাবারের প্রতিযোগিতাও করেছিলেন!

দুজনে মিলে তাঁর জীবনী পড়ুন। তিনি ছিলেন এক আদর্শ স্বামী। আসুন, আমরা সবাই তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করি।

'এক তরুণ সাহাবি একবার বিধবা এক নারীকে বিয়ে করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ সেই খবর শুনে তাঁকে বলেছিলেন—“তুমি কুমারী নারীকে কেন বিয়ে করলে না? তাহলে তুমি তাঁর সাথে আনন্দ করতে পারতে, সেও তোমার সাথে আনন্দ করতে পারত।”' সহিহ বুখারি

তো আপনি আর কীসের জন্য অপেক্ষা করছেন! যদি ইতোমধ্যেই বিবাহিত হয়ে থাকেন, তাহলে আপনাদের দাম্পত্য সম্পর্ককে আরও সুন্দর করুন। আনন্দ আর তৃপ্তির উৎসে পরিণত করুন আপনাদের দাম্পত্যজীবনকে। যদি বিবাহিত না হন, তাহলে শিগগিরই বিয়ে করে ফেলুন, অনেকগুলো বাচ্চা নিন–যাতে করে একসঙ্গে সবাই মিলে এই লিস্টে বিনোদনের যে দশটি উপায়ের কথা বলা হলো, সেগুলো উপভোগ করতে পারেন।

আশা করি, তালিকাটি সবার ভালো লেগেছে। সবাই এ থেকে উপকৃত হয়েছেন। আরও আশা করি, ইসলাম চর্চা ও উপভোগের জন্য এবং হালাল জীবনযাপনের জন্য এই তালিকাটি বেশ কাজে দেবে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সরল-সঠিক পথের ওপর রাখুন। আমাদের অন্তরে ইসলামের প্রতি ভালোবাসা ছড়িয়ে দিন। আমিন।

তথ্যসূত্র:
[হালাল বিনোদন, পৃষ্ঠা: ৮০-৮৫]

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post