আমি আমার সকল ভাই–বোনদের বলতে চাই, তুমি ডিপ্রেশনে থাকো কিংবা না থাকো, সবসময় নিজের জীবনেই বাঁচো। অন্যদের জীবনে থাকতে যেয়ো না। তা পারবে না। বিনিময়ে কষ্ট কুড়োতে হবে।
আমাদের এ যুগের তরুণ–তরুণীদের ক্ষেত্রে দেখা যায়, তারা নিজেদের জীবন ছেড়ে অন্য কারও জীবনে থাকতে চায়। আর অন্য কারও সুখগুলোকে অনুভব করতে গিয়ে সে নিজের সুখ উপভোগ করতে ভুলে যায়। তারা সারাক্ষণ অন্যেরা কী করছে, অন্যদের জীবনে কী চলছে, অন্যেরা কোথায় যাচ্ছে—তা দেখেই সময় পার করে। তাই নিজেকে নিয়ে আর সন্তুষ্ট থাকতে পারে না। এই অসন্তুষ্টি থেকেই মূলত হতাশার জন্ম নেয়, অনর্থক চাওয়াগুলো না–পাওয়ার শূন্যতায় সে অকারণেই কষ্ট পেতে থাকে।
এই সমস্যার জন্য দায়ী মূলত ফেসবুক, ইন্সটাগ্রাম এবং এর মতো অন্য সব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। এর কনসেপ্ট আমাকে বিস্মিত করে। পৃথিবী আজকে এই ভার্চুয়াল সমাজকে এত বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে, এর পেছনে এত বেশি সময় অপচয় করছে যে, বাস্তবতার জীবনের মধ্যেই মানুষকে আরেকটা জীবন সামলাতে হচ্ছে।
পৃথিবীতে এর পূর্বে অন্য কারও অবস্থা জানার উপায় ছিল না। ফলে অন্য কাউকে নিয়ে ভাবার মতো এত সময় বা সুযোগও ছিল না। কিন্তু আজকে একজনের জীবনের পুরোটাই জানা সম্ভব। তাই এত সমস্যা তৈরি হচ্ছে।
প্রতিনিয়ত অন্য কারও জীবনের কাজকর্ম, তাদের অভ্যাস, তাদের সুখের চিত্র দেখে তুমি কষ্ট পাচ্ছ। তাদের জীবনের থেকে তোমার জীবন হয়তো একটু কম উন্নত। তাদের সুখের চাইতে তোমার সুখের পরিমাণ হয়তো একটু কম। তাদের অর্জন দেখে তুমি নিজের অভাব খুঁজে বেড়াচ্ছ। এভাবেই মূলত তোমার ভেতরে দুশ্চিন্তা তৈরি হয়।
আমি আশ্চর্য হই, আজকে আমরা কতটা মূল্যহীন হয়ে গেছি যে, আমার অন্যকে জানাতে হচ্ছে—আমি কোথায় আছি, কী করছি, কী খাচ্ছি, আর কার সাথে আছি!
অন্যরা কী করছে করুক না। কিন্তু তুমিও কি এতটাই মূল্যহীন হয়ে পড়েছ যে, তোমার এখন অন্য ব্যক্তিদের জীবন দেখে বাঁচতে হবে? অন্য কারও সুখ তোমাকেও পেতে হবে? অন্য কাউকে অনুসরণ করতে হবে?
আমার ভাই/বোন! তুমি এমন একটা জীবনের দিকে চেয়ে আছ, যা তোমার নয়, যা কখনও তোমার ছিল না। তোমাকে সে জীবন দেওয়াই হয়নি, হয়তো সামনেও দেওয়া হবে কি না তুমি জানো না। তাহলে সেই জীবনের দিকে তাকিয়ে কীই-বা লাভ বলো?
তোমার মাসিক বেতন যদি ১০ হাজার হয়, তবে তুমি সে অনুযায়ী নিজের জীবন পরিচালনা করো। তুমি কেন ৫০ হাজার টাকা বেতনের ব্যক্তিদের দিকে তাকিয়ে থাকতে যাও?
যে পুরুষ দিন-রাত বাইরের নারীদের প্রতি কামুকতার চোখে তাকিয়ে থাকে, অন্যের স্ত্রীদের কামনা করে সে ঘরে ফিরে এসে নিজের স্ত্রীকে দেখে বলে, আমি তার ওপর অতিষ্ঠ। হ্যাঁ, তোমাকে অতিষ্ঠ হতেই হবে, কেননা তুমি নিজের সুখ বাদ দিয়ে অন্য কারও সুখের কল্পনা করছ।
তুমি যে সারাদিন ফেসবুকে ডুবে আছ, তোমার কি আসলেই করার মতন কিছু নেই? তুমি কি নিজের জীবন নিয়ে একেবারে বিরক্ত? কেন এসব অনর্থক জিনিসের পেছনে নিজের সময়গুলো অপচয় করছ, আর কেন এখনও দীন থেকে দূরে সরে থাকছ?
অথচ যতই সারাদিন নিজের অবস্থার কথা জানাও না কেন, তুমি কী করছ না করছ, তাতে আমার কোনো যায় আসে না। কারোরই কিছু যায় আসে না। তুমি কী খাচ্ছ না খাচ্ছ, কোথায় যাচ্ছ না যাচ্ছ, তাতে আমার কিছু যায় আসে না।
অনেক বোন আজ আয়নায় নিজেদের দিকে তাকিয়ে নিজেকে নিয়ে সন্তুষ্ট হতে পারে না!
আমার বোন! জেনে রাখো, তুমি যেমন আছ, তুমি কখনোই এর থেকে অধিক সুন্দর হতে পারবে না। কেন জানো? কারণ তুমি অমুক তমুক কারও সৃষ্টি নও। তুমি যেমন, আল্লাহ তোমাকে সেভাবেই সৃষ্টি করেছেন। আর যদি মানুষ তা পছন্দ না করে, তবে তারা জাহান্নামে যাক। তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখো, চোখ বন্ধ করে ফেলো, কানে আঙুল চেপে ধরো, যাতে তাদের কোনো অনর্থক কথা তোমার ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে।
তুমি যেমন, আল্লাহ তোমাকে সেভাবেই ভালোবাসেন। তুমি যেমন, আল্লাহ তোমাকে সেভাবেই নিজের দাসত্বের জন্য চান। আল্লাহ এভাবে তোমাকে সৃষ্টি করেছেন, কারণ তিনি নিজেই তোমার জন্য এই গঠন আর এই চেহারা চেয়েছেন।
আল্লাহ তোমাকে আবৃত রাখতে চান, লুকিয়ে রাখতে চান, তোমার সবকিছু তিনি অন্যদের থেকে পবিত্র রাখতে চান। তোমার স্রষ্টা যেখানে এই অবস্থাতেও তোমার ওপর সন্তুষ্ট, তুমি তাহলে আর কী নিয়ে দুশ্চিন্তা করছ?
ডিপ্রেশন মূলত একটা শূন্যতা। আর এটা তখনই তোমার ভেতরে প্রবেশ করে, যখন তুমি কোনোকিছুর অভাব বোধ করো। তবে সবকিছু থাকা সত্ত্বেও যদি তোমার ডিপ্রেশন থাকে, তাহলে তুমি সবচাইতে বেশি অভাবগ্রস্ত। কেননা তোমার অন্তরে এখনও ইমান প্রবেশ করেনি। তুমি আল্লাহর দিকে ফিরে আসো, তাহলেই সব শূন্যতা দূর হয়ে যাবে। আর যদি তুমি ইমানদার হয়েও দুর্বলতা অনুভব করো, তবে এটা তোমার পাপ, যা অন্তরে অপবিত্রতা ঢেলে দিয়েছে। তাই সর্বাবস্থায় সতর্ক থাকো।
তথ্যসূত্র:
[উদ্দেশ্যহীন আর কত দিন? পৃষ্ঠা: ২৪৯-২৫১]
