আল্লাহ বলেন: 'আমিই আল্লাহ, আমি ছাড়া সত্যিকারের কোন ইলাহ নেই, কাজেই আমার ইবাদাত কর, আর আমাকে স্মরণ করার উদ্দেশ্যে নামায কায়েম কর-২০:১৪। নিশ্চয়ই নামায বিরত রাখে অশ্লীল ও মন্দ কাজ হতে। আল্লাহর স্মরণই সর্বশ্রেষ্ঠ-২৯:৪৫। আর যে আমার স্মরণে বিমুখ তার জীবন যাপন হবে সংকুচিত-২০:১২৪। যে ব্যক্তি দয়াময় আল্লাহর স্মরণে বিমুখ হয় আমি তার জন্য নিয়োজিত করি এক (অদৃশ্য) শয়তান, অতঃপর সে হয় তার (মনের) সহচর-৪৩:৩৬। নিঃসন্দেহে আমি অবিশ্বাসীদের জন্য শয়তানকে বন্ধু ও অভিভাবক বানিয়ে দিয়েছি-৭:২৭। আল্লাহই হচ্ছেন বিশ্বাসীদের অভিভাবক। তিনি তাদেরকে অন্ধকার হতে আলোর দিকে নিয়ে যান-২:২৫৭। এই কুরআন সমগ্র জগতবাসীর জন্য উপদেশের ভান্ডার ছাড়া কিছুই নয়-৬:৯০। প্রতিটি প্রাণী মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। আর অবশ্যই কিয়ামতের দিনে তাদের প্রতিদান পরিপূর্ণভাবে দেয়া হবে-৩:১৮৫। তোমাদের মধ্যে ঐ ব্যক্তিই আল্লাহর নিকট অধিক মর্যাদা সম্পন্ন যে অধিক মুত্তাকী-৪৯:১৩।'

প্রেমে পড়া

প্রশ্ন: প্রেম স্বর্গীয়। নিজেকে বিশ্বপ্রেমিক ভাবতেই ভালো লাগে। আগে সুন্দর কাউকে দেখলেই ভালো লাগত। প্রেম করতে ইচ্ছে করত। বন্ধুরাও উৎসাহ দিত। কখন যে জড়িয়ে পড়তাম টেরও পেতাম না! কিন্তু কোনো সম্পর্কই বেশিদিন টেকে নি। এখনো আমি বিপরীত লিঙ্গের প্রতি প্রচণ্ড আকর্ষণ অনুভব করি! আবার হতাশায়ও ভুগি। এ থেকে মুক্তির উপায় কী?

উত্তর: প্রেম নিঃসন্দেহে স্বর্গীয়। তবে মর্ত্যে আসতে আসতে এর মধ্যে নানা বৈষয়িক মিশেলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে এটা হয়ে গেছে পণ্য। স্বর্গীয় প্রেম হচ্ছে অকাতরে নিজেকে উজাড় করে দেয়ার নাম। যেমন, দেশপ্রেম-দেশের জন্যে নিজের সবকিছু উজাড় করে দেয়ার নাম; স্রষ্টাপ্রেম-স্রষ্টার চিন্তায় বিভোর থাকার নাম; মানবপ্রেম-মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিবেদিত করার নাম। স্থানকাল ভেদে প্রেমের প্রকাশ ঘটে কখনো মমতায়, কখনো শ্রদ্ধায়, কখনো ভালবাসায়, কখনো সমমর্মিতায়। আপনি নিজেকে 'বিশ্বপ্রেমিক' ভাবলে দোষ নেই, যদি বিশ্বের কল্যাণে নিজেকে উজাড় করে দিতে পারেন।

আবার সুন্দর কাউকে বা কিছুকে ভালো লাগার মধ্যেও কোনো দোষ নেই, যদি বিষয়টি সীমার মধ্যে থাকে। তবে আপনি যাকে প্রেম বলছেন, এটা আসলে নরনারীর পরস্পরের প্রতি একটা স্বাভাবিক আকর্ষণ। এর শুরুটা ভালোলাগা থেকে। কিন্তু সময় এগিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে তা শুধু ভালোলাগায় সীমিত থাকে না। সৃষ্টি হয় তীব্র আবেগ ও জৈবিক আকর্ষণ। যার সুস্থ পরিণতি হচ্ছে বিয়ে ও সুন্দর পরিবার। আর অসুস্থ পরিণতি হচ্ছে আসক্তি ও অনিয়ন্ত্রিত যৌনাচার। একেই তখন বলা হয় প্রেমাসক্তি বা প্রেমরোগ, যা মাদকাসক্তির চেয়েও ক্ষতিকর।

মাদক যে-রকম একজন মানুষের সুস্থ বোধবুদ্ধি নাশ করে ফেলে, প্রেমরোগ বা প্রেমাসক্তিও তা-ই করে। এটা আমাদের কথা নয়, বিজ্ঞানীদের গবেষণালব্ধ ফল। এ সম্পর্কে এক সাড়া জাগানো গবেষণা চালান ইতালির পিসা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক ডোনাতেলা ম্যারাযিতি। মাত্র ছয় মাস বা তারও কম সময় ধরে প্রেম করছে, এমন ২০ জুটিকে নিয়ে তিনি এ গবেষণাটি পরিচালনা করেন। এ ধরনের জুটিদের বেছে নেবার কারণ ছিল, প্রেমে পড়ার এই ধাপটায় প্রেমিক প্রেমিকারা আসলে একজন আরেকজনের কথা ভেবেই বেশিরভাগ সময় পার করে। তা-ই হচ্ছিল। এই জুটিরা দিনে অন্তত চার ঘণ্টা সময় হয় একসাথে থাকত, নয়তো একজন আরেকজনের কথা ভাবত।

এদের ব্লাড স্যাম্পলের সাথে অবসেসিভ কমপালসিভ ডিজঅর্ডার (ওসিডি) নামক মানসিক অসুস্থতায় আক্রান্ত রোগীদের ব্লাড স্যাম্পল মিলিয়ে অধ্যাপক ম্যারাযিতি দেখলেন, দুই দলেরই দেহে সেরোটোনিনের মাত্রা স্বাভাবিক মানুষ, যারা প্রেমে পড়ে নি বা মানসিক অসুস্থতায়ও আক্রান্ত নয় তাদের চেয়ে ৪০% কম।

সেরোটোনিন হলো মস্তিষ্কের এমন এক নিউরোট্রান্সমিটার, যার পরিমাণ কমে গেলেই বিষণ্ণতা অবসাদ খিটখিটে মেজাজ অর্থাৎ ওসিডির মতো মানসিক রোগ দেখা দেয়। মনোবিজ্ঞানী অ্যালেন বার্শাইড বলেন, প্রেমে পড়লে মানুষ যে বোধবুদ্ধিশূন্য হয়ে যায়, প্রেমিক বা প্রেমিকার সবকিছুকেই যে তখন ভালো লাগে, দোষ থাকলেও তা যে চোখ এড়িয়ে যায়, তার কারণ এটাই। অন্ধ আবেগে ঝাঁপিয়ে পড়ে মানুষ তখনই ভুল সিদ্ধান্ত নেয়।

ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ম্যাগাজিনের ফেব্রুয়ারি ২০০৬ সংখ্যায় লাভ দ্যা কেমিক্যাল রি-একশন শিরোনামে এই বিস্তারিত প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়। তবে বিজ্ঞানীরা বলেছেন, এ প্রেমাবেগের স্থায়িত্ব আবার খুবই কম। আজকে যাকে না পেলে বাঁচব না বলে মনে হচ্ছে, বছর না ঘুরতেই মনে হতে পারে যে, তাকে না ছাড়লে বাঁচব না। ছয় মাস আগেও যে চেহারাটা এক নজর দেখার জন্যে অস্থির হতো মন, এখন সে চেহারাটাই হতে পারে সবচেয়ে অসহ্য দৃশ্য।

এর কারণ কী? বিজ্ঞানীরা বলেছেন, এর পেছনে আছে ডোপামিন নামে আরেক নিউরোট্রান্সমিটারের ভূমিকা। প্রেমিক/ প্রেমিকাকে দেখলে মস্তিষ্কের একটি বিশেষ অংশ এই ডোপামিন দ্বারা উদ্দীপ্ত হয়। এর প্রভাবে শরীর-মনে সৃষ্টি হতে পারে বাঁধভাঙা আনন্দ, অসাধারণ প্রাণশক্তি, গভীর মনোযোগ ও সীমাহীন অনুপ্রেরণা। এজন্যেই হয়তো যারা সদ্য প্রেমে পড়ে, হঠাৎ করেই তাদের মধ্যে এক ধরনের বেয়াড়া, একগুঁয়ে, দুঃসাহসী চরিত্র ফুটে ওঠে। ঘর ছাড়বে, সিংহাসন ছাড়বে, জীবন দেবে; তবু প্রেম ছাড়বে না-এমনই এক বেয়াড়াপনা দেখা যায় তাদের মধ্যে। বিজ্ঞানীরা বলেন, মাদকাসক্তির সাথে এ অবস্থার প্রচণ্ড মিল রয়েছে।

কারণ পরিমাণ যা-ই হোক, দেখা যায়, কিছুদিনের মধ্যেই মাদকসেবী ঐ পরিমাণে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে এবং নেশা হওয়ার জন্যে আরো বেশি পরিমাণে মাদক সে নিতে চায় বা নেয়। প্রেমের ক্ষেত্রেও তা-ই। তীব্র প্রেমাবেগের আতিশয্য খুব বেশি সময় স্থায়ী হয় না, যদি নতুন নতুন উদ্দীপক সংযোজিত না হয়। কিন্তু বাস্তব জীবনে তো আর তা সম্ভব নয়। ফলে অল্পতেই ঘোলাটে হয়ে যায় প্রেমাবেগের রঙিন চশমা।

আসলে স্বর্গীয়, পবিত্র ইত্যাদি নানারকম বিশেষণ যুক্ত করে যে প্রেমকে মহান বানানোর চেষ্টা চলে, তা যে স্রেফ বংশধারা রক্ষার জন্যে নারী-পুরুষের জৈবিক চাহিদারই নামান্তর, তা বিজ্ঞানীদের কথায় স্পষ্ট হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, পারস্পরিক আকর্ষণের ক্ষেত্রে একজন পুরুষ বা একজন নারী অবচেতনভাবেই এমন সঙ্গীকে পছন্দ করে, যে তাকে সুস্থ সবল একটি সন্তান উপহার দিতে পারবে। এক জরিপে দেখা গেছে, মহিলাদের কোমর ও হিপের বিশেষ গড়ন এবং পুরুষদের লম্বা-চওড়া ও শক্ত গড়ন, যা তাদের টেস্টোস্টেরন হরমোন উৎপাদন ক্ষমতা বেশি হওয়াকে নির্দেশ করে, তার ওপর নির্ভর করে কে কতটা আকর্ষণীয় হবে। আর নারী ও পুরুষের এ দুটো বৈশিষ্ট্যই তাদের সন্তান জন্মদানের সামর্থ্যকে সরাসরি প্রভাবিত করে।

তাই আপনি প্রেমকে রোগে পরিণত না করে স্বাভাবিক সীমার মধ্যে রাখুন। ভালো লাগার শক্তিকে সুখী পরিবার নির্মাণে কাজে লাগান। আপনার হতাশা থাকবে না। এগিয়ে যাবেন আপনি মুক্ত ও পরিতৃপ্ত জীবনের পথে।

তথ্যসূত্র:
[পর্ব ৩॥ প্রেম-বিয়ে-পরিবার, পৃষ্ঠা: ১৩-১৫]






Post a Comment (0)
Previous Post Next Post